বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৫ আগস্ট ২০২৪ এমন একটি দিন, যেটা আর পাঁচটা দিনের সঙ্গে তুলনা করার কোনো সুযোগ নেই। দিনটিকে মানুষ মনে রাখবে একটি দীর্ঘ সময় ধরে জমে থাকা অসন্তোষ ও গণদাবির উত্থান হিসেবে। দিনটিতে শুধু একটি ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হয়নি, বরং ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ সাহসিকতায় একটি দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠিত দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রকে পিছু হঠাতে বাধ্য করার ঘটনা মনে রাখার মতো।
ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা বিরল—যেখানে দীর্ঘ ষোলো বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা সরকার মাত্র কয়েক ঘণ্টার চাপেই পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। এই ঘটনা শুধু রাষ্ট্রক্ষমতার পালাবদল নয় এটা ছিল ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য এক মৌলিক রূপান্তর।
ঢাকার সকালটা ছিল রীতিমতো নিঃশ্বাস আটকে রাখার মতো। ইন্টারনেট বন্ধ, মোবাইল নেটওয়ার্ক সীমিত, সেনা টহল, পুলিশি চেকপোস্ট সব মিলিয়ে যেন একটা অঘোষিত জরুরি অবস্থা। আগের দিন রাতেই সরকার দেশের নানা প্রান্তে দমন অভিযান চালায়। কিন্তু ইতিহাস বলে, ভয় কখনো জনতার পথ আটকাতে পারেনি।
সকাল গড়াতেই স্পষ্ট হয়ে যায় এই দিনটা অন্য রকম। শাহবাগ, টিএসসি, নীলক্ষেত, কারওয়ান বাজার, ধানমন্ডি সব জায়গায় ছাত্র ও মানুষের ঢল নামে। কেউ কারফিউ মানে না, কেউ অপেক্ষাও করে না। মিছিল, স্লোগান, প্রতিবাদ সব যেন সময়ের আগেই একজায়গায় এসে জমে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরের প্রতিটি স্লোগান শুধু প্রতিবাদ ছিল না, ছিল প্রত্যয়ের অগ্নিশপথ।
এই জাগরণ হুট করে আসেনি। বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক দমন, বাকস্বাধীনতার হরণ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং প্রহসনের নির্বাচনের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ জমে উঠছিল। কিন্তু ৫ ই আগস্ট ছিল সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণের দিন। ছাত্র-জনতার “মার্চ টু ঢাকা” কর্মসূচির তারিখ হঠাৎ একদিন এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। রাজধানীতে ঢুকতে শুরু করে হাজারো মানুষ, আর তখনই স্পষ্ট হয়—এই জনস্রোত আর থামানো যাবে না।
শুধু রাজধানী নয় চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ থেকে রাজশাহীর সাহেববাজার, খুলনার নিউমার্কেট থেকে বরিশালের কালিজিরা মোড় সারা দেশের মানুষ একসঙ্গে দাঁড়ায়। তাদের কাছে এটি কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল না, বরং নিজেদের অধিকার ফিরে পাওয়ার সংগ্রাম। সেদিন ৭১-এর মতোই মানুষ নিজে নিজেই রাস্তায় নেমে এসেছিল। সেই ঐতিহাসিক তুলনাটা এখন কল্পনা নয়, বাস্তব ইতিহাস।
গণভবনে তখন অন্য রকম এক চাপা উত্তেজনা। নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে বসেন। তথ্য অনুযায়ী, সেখানে পরিস্থিতি কঠোর হাতে দমন করার আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। কিন্তু বাহিনীপ্রধানরা জানান, পরিস্থিতি সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একপ্রকার নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
শেখ হাসিনার জেদ তখনও টলানো যায়নি। এরপর পরিবারের সদস্য বিশেষ করে শেখ রেহানা, এবং ফোনে বিদেশে অবস্থানরত সজীব ওয়াজেদ জয় তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন। এই বোঝানো কেবল পারিবারিক আবেদনের ভাষা নয়, বরং বাস্তবতার নিরীখে নেওয়া এক সর্বশেষ কূটনৈতিক প্রয়াস।
বারবার আলোচনার পর, অবশেষে শেখ হাসিনা দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে পদত্যাগ করে ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যান।
এই পদত্যাগ কোনো ঘোষণার মাধ্যমে নয়, বরং বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত। পরে জানা যায়, তিনি ভারতের হয়ে নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন এবং সেখান থেকে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
যখন খবর ছড়ায় যে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন, তখন সারা দেশে যে আবেগের বিস্ফোরণ ঘটে, তা শব্দে বর্ণনা করা কঠিন।
৫ আগস্ট কেবল একটি সরকারের পতনের দিন নয়, এটি এক গণজাগরণের পরীক্ষিত বাস্তবতা। রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে অবিশ্বাস, ক্ষমতার দম্ভ, জনগণকে ভয় পাওয়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল সেই দেয়ালে ফাটল ধরানো এই দিন।
লেখক, সুবর্ণা মেহজাবীন
কৃতজ্ঞতায় : দেশকাল নিউজ ডটকম