একজন সংসদ সদস্যের (এমপি) দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ সদস্যদের জন্য উপজেলা পরিষদে বসার ব্যবস্থা করতে যাচ্ছে সরকার। কক্ষ তৈরির জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের চিঠিও দেওয়া হয়েছে। তবে শুধু সংসদ সদস্যদের জন্য উপজেলা পরিষদে কক্ষ করার বিধান না থাকায় আইনি জটিলতা এড়াতে ‘পরিদর্শন কক্ষ’ নামের ওই কক্ষে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও বসার সুযোগ রাখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদে বসার ব্যবস্থা করার মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকারের এই প্রতিষ্ঠানে তাঁদের খবরদারির সুযোগ তৈরি হতে পারে। সংসদ সদস্য উপস্থিত থাকলে সেখানে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা পরিষদের কার্যক্রমে তার প্রভাব পড়বে। জাতীয় সংসদে গত ৩১ মার্চ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মুজাহিদ নির্বাচনী এলাকায় সংসদ সদস্যদের বসার জায়গা করে দেওয়ার দাবি জানান। এরপর স্থানীয় সরকার বিভাগ ২১ এপ্রিল মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিভাগীয় কমিশনার, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জন্য উপজেলা পরিষদে উন্নতমানের আসবাবে সজ্জিত; ওয়াশরুমসহ একটি পরিদর্শন কক্ষ স্থাপনের নির্দেশনা দিয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী এবং সব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) চিঠি পাঠিয়েছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গত মঙ্গলবার সংসদে বিষয়টি জানান। তিনি জানান, সংসদ সদস্যদের নামে কক্ষ বরাদ্দের বিধান না থাকায় এর নাম হবে ‘পরিদর্শন কক্ষ’। স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্র জানায়, উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের নামে কক্ষ বরাদ্দের নিয়ম না থাকায় আইনি জটিলতা এড়াতে সংসদ সদস্যদের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদেরও ওই কক্ষ ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। একজন কর্মকর্তা বলেন, সচিব ছাড়াও মন্ত্রণালয়-বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিভিন্ন সরকারি দপ্তর পরিদর্শনে যান। কোথাও তাঁদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা করা নেই। উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের বসার জায়গা ঠিক করতে পরিদর্শন কক্ষে তাঁদের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের বসার সুযোগও রাখা হয়েছে। উপজেলা পরিষদে শুধু সংসদ সদস্যদের জন্য বসার ব্যবস্থা করলে আইন লঙ্ঘন হতো বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপজেলা অধিশাখার যুগ্ম সচিব আবু রাফা মোহাম্মদ আরিফ। তিনি বলেন, শুধু তো সংসদ সদস্যদের জন্য ওই পরিদর্শন কক্ষ করা হচ্ছে না। ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারাও সেখানে বসবেন। ফলে আইন লঙ্ঘন হচ্ছে না। ১৯৮০-এর দশকে তৎকালীন এইচ এম এরশাদ সরকার উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থা চালু করে। ১৯৯১ সালে উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। ২০০৯ সালে এই ব্যবস্থা পুনরায় চালু করা হয়। উপজেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা। উপজেলা পরিষদকে উপদেষ্টার পরামর্শ নিতে হয়। উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের জন্য বসার জায়গা তৈরিকে স্থানীয় সরকারের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।
তিনি গতকাল বুধবার বলেন, ‘এটা আমাদের স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেবে। স্থানীয় নির্বাচনও হবে না, যদিও এটা শাসনব্যবস্থার একটা উল্লেখযোগ্য স্তম্ভ। এটা সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’ আইন প্রণয়ন, নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং স্থানীয় জনগণের সমস্যাগুলো নীতিনির্ধারকদের কাছে সংসদের মাধ্যমে উপস্থাপন করা সংসদ সদস্যদের অন্যতম কাজ। এদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে উপজেলা পরিষদের দায়িত্ব হলো স্থানীয় নাগরিকদের সমস্যা মোকাবিলা করা। বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘সংসদ সদস্যদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ২০০১ সালের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে জেলা মন্ত্রী করার জন্য প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল, আদালত ওই প্রজ্ঞাপন অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। আমি জানি না এখন কী কারণে, কোন যুক্তিতে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে?’ তিনি বলেন, সুযোগ-সুবিধার ব্যাপারে সরকারি দল, বিরোধী দল সবাই একমত, এটা অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। এখন এমপিরা সব নিয়ন্ত্রণ করবেন, যেটা শেখ হাসিনার আমলে করেছিল।’
তাঁর মতে, উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকা সংসদ সদস্যদের উপজেলায় বসার ব্যবস্থা হলে তাঁরাই সেখানকার প্রধান নির্বাহী হয়ে যাবেন। সংসদ সদস্যদের জন্য উপজেলা পরিষদে বসার কক্ষ রাখার কোনো প্রয়োজন নেই বলে মত দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম। তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসনে বসা মানে সেখান থেকে তাঁরা প্রভাবিত করার চেষ্টা করবেন। যখন একজন সংসদ সদস্য উপজেলা পরিষদে উপস্থিত থাকবেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি অনুসারে এর প্রভাব অবশ্যই উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা পরিষদের কার্যক্রমের ওপর পড়তে বাধ্য। এই প্রভাব পড়া মানে হচ্ছে, সরকার বা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব সেখানে একধরনের হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করবে, যেটা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত। এটা তাঁদের আইনানুগ দায়িত্ব ও কর্মপরিধির লঙ্ঘন।