‘আমি মরি নাই! আমি মিজানুর রহমান সোহেল। পেশায় লেখক ও সাংবাদিক। এবং হ্যাঁ, আমি এখনো জীবিত আছি।’ সোমবার (১৭ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে এভাবেই নিজের জীবিত থাকার বিষয়টি জানিয়েছেন সাংবাদিক ও লেখক মিজানুর রহমান সোহেল। এর আগে সোমবার সকাল থেকে নিজের পরিচিতজন, সহকর্মী ও সাংবাদিকদের একের পর এক ফোন পেতে থাকেন তিনি। এ ছাড়া মিজানুর রহমান সোহেলের বাসায় তার আত্মীয়স্বজনসহ শুভানুধ্যায়ীরা ফোন করে অনেকে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চান, তিনি বেঁচে আছেন কি না।
এর কারণ হিসেবে সোহেল জানান, ঢাকার হোটেল ওয়েস্টিনে অনুষ্ঠিত একটি অনুষ্ঠানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একটি প্রেজেন্টেশনে তাকে ২০২৪ সালের ৪ জুলাই হবিগঞ্জে ‘শহীদ’ সাংবাদিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে সেখানে যে নাম ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি সাংবাদিক সোহেল আকাঞ্জির। আর সেই নামের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে মিজানুর রহমান সোহেলের ছবি। ডেমোক্রেটিক জার্নালিস্ট অ্যালায়েন্স (ডিজেএ) আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম। সোমবার সকাল ১০টায় হোটেল ওয়েস্টিনের বলরুমে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানের প্রেজেন্টেশনে ব্যবহৃত ছবিটি এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযো গমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। বিষয়টি জানতে পেরে বিস্ময় ও হতাশা প্রকাশ করে সোহেল বলেন, একজন জীবিত মানুষকে মৃত বা শহীদ হিসেবে উপস্থাপন করা নিছক কোনো তথ্যগত ভুল নয়। এর সঙ্গে একজন মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত পরিচয় সরাসরি জড়িত। তিনি বলেন, ভুলটি কোনো ব্যক্তিগত আলাপচারিতা বা অনানুষ্ঠানিক পোস্টে হয়নি; বরং একটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানের প্রেজেন্টেশনে তাকে এভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্রে বলা হয়েছিল, জুলাই গণ- অভ্যুত্থানের সময় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাংবাদিকেরা কাজ করেছেন এবং দেশ-বিদেশের মানুষের সামনে সত্য তথ্য তুলে ধরেছেন। সাংবাদিকদের সাহস, ভূমিকা ও আত্মত্যাগ স্মরণে এমন আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ বলেও মনে করেন সোহেল। তবে সত্য তথ্য তুলে ধরার কথা বলা এমন একটি অনুষ্ঠানের প্রেজেন্টেশনেই একজন জীবিত সাংবাদিককে শহীদ হিসেবে উপস্থাপনের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
তার মতে, একজন সাংবাদিকের নামের সঙ্গে ছবি যুক্ত করার আগে ছবিটি কার, নামটি কার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জীবিত না মৃত—এসব তথ্য অন্তত একবার যাচাই করা প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের মতো স্পর্শকাতর একটি বিষয়ে তথ্য যাচাইয়ের দায়িত্ব আরো বেশি বলে মনে করেন তিনি। সোহেল প্রশ্ন তোলেন, একজন সাংবাদিকের ছবি সংগ্রহ, তা প্রেজেন্টেশনে ব্যবহার এবং তার সঙ্গে একজন শহীদের পরিচয় যুক্ত করার পুরো প্রক্রিয়ায় কারো মনে একবারও প্রশ্ন জাগেনি কি না। তথ্য যাচাই করা এত কঠিন ছিল কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি। তিনি জানান, অনুষ্ঠানস্থল থেকেই প্রথম কয়েকজন সাংবাদিক তাকে ফোন করেন। প্রথমে বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব না দিলেও পরে ফোনের সংখ্যা বাড়তে থাকে।
নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে সোহেল বলেন, তিনি জুলাই আন্দোলনে শহীদ হননি এবং ২০২৪ সালের ৪ জুলাই হবিগঞ্জেও মারা যাননি। তিনি জীবিত আছেন, এখনো লিখছেন এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তার মতে, একটি ভুল তথ্য, ভুল ছবি ও ভুল উপস্থাপনা মুহূর্তের মধ্যেই একজন জীবিত মানুষকে অন্যদের কাছে মৃত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে দিতে পারে। এমন ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়লে কেউ তা বিশ্বাস করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করতে পারেন, এমনকি তার পরিবার বা পরিচিতদের কাছেও শোকবার্তা পাঠাতে পারেন। এতে একজন সাংবাদিকের ব্যক্তিগত পরিচয় ও পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই ভুলের দায় কার—সে প্রশ্নও তুলেছেন সোহেল। তথ্য সংগ্রহ, নাম ও ছবি যাচাই, প্রেজেন্টেশন তৈরি এবং তা অনুমোদনের পুরো প্রক্রিয়ায় কারা ছিলেন তা জানতে চেয়েছেন তিনি। তবে কাউকে অযথা অভিযুক্ত করতে চান না জানিয়ে সোহেল বলেন, তিনি শুধু দায়িত্বশীল ব্যাখ্যা ও ভুল তথ্যের সংশোধন চান।
নিজের করণীয় প্রসঙ্গে তিনি জানান, প্রথমে কী করবেন বুঝতে না পারলেও পরে মনে হয়েছে, চুপ করে থাকার সুযোগ নেই। কারণ, সোমবারই কয়েকজন তাকে ফোন করে জানতে চেয়েছেন তিনি বেঁচে আছেন কি না। ভুল তথ্যটি আরো কত মানুষের কাছে পৌঁছাবে, তা তিনি জানেন না। ফেসবুক পোস্টে সোহেল স্পষ্ট করেছেন, নিজের প্রচারের জন্য নয়, বরং ভুল তথ্যটি পরিষ্কার করতেই তিনি বিষয়টি প্রকাশ্যে জানিয়েছেন।