টানা পাঁচ মাসের বেশি বন্ধ থাকার পর খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট)-এর একাডেমিক কার্যক্রম আগামী মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) থেকে শুরু হতে যাচ্ছে বলে আশ্বাস দিয়েছেন নবনিযুক্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মাকসুদ হেলালী।
গত ২৪ জুলাই (বৃহস্পতিবার) সরকার তাঁকে কুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয় এবং পরদিন ২৫ জুলাই (শুক্রবার) তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে টানা দুই দিন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা করেন। সব পক্ষের ইতিবাচক মনোভাব ও সহযোগিতার আশ্বাস পেয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
আজ (২৭ জুলাই), রবিবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় অধ্যাপক হেলালী বলেন,
“আমি সদ্য দায়িত্ব নিয়েছি। পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেছি এবং সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলেছি। আমার বিশ্বাস, আলোচনার মাধ্যমেই যেকোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব। মঙ্গলবার থেকে ক্লাস শুরু হবে এবং এ সংক্রান্ত অফিসিয়াল নোটিশ শিগগিরই জারি করা হবে।”
সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক পর্যায়ের সব বিভাগের ভিপি (ভাইস প্রেসিডেন্ট) ও সিআর (ক্লাস রিপ্রেজেন্টেটিভ) উপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে উপাচার্য আরও বলেন, “আমাদের কুয়েট একটি স্বনামধন্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। এই প্রতিষ্ঠানের সুনাম শিক্ষার্থীদের পরিশ্রম, শিক্ষকদের অবদান ও প্রশাসনের দায়িত্বশীলতায় গড়ে উঠেছে। আমরা চাই শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনের একটি মুহূর্তও যেন নষ্ট না হয়। প্রশাসন সব সময় একটি শান্তিপূর্ণ ও সচল একাডেমিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে চায়।”
তিনি শিক্ষার্থীদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বলেন,
“যেকোনো সমস্যা সমাধানে আমরা আন্তরিক। আলোচনার মাধ্যমেই স্থায়ী সমাধান সম্ভব। কুয়েটকে প্রযুক্তি, জ্ঞান ও মানবিক মূল্যবোধে উজ্জ্বল প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”
একাডেমিক কার্যক্রমের সঙ্গে সমন্বয় রাখতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি জোরদার করতেও কাজ শুরু করেছেন উপাচার্য। শনিবার সকালে তিনি খানজাহান আলী, দৌলতপুর ও আরংঘাটা থানার ওসিদের নিয়ে এক সমন্বয় সভায় বসেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক ইলিয়াস আখতার ও সংশ্লিষ্ট তিন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।
সভায় উপাচার্য বলেন, “আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে কুয়েটকে একটি নিরাপদ, শৃঙ্খলিত এবং মানসম্মত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা। শিক্ষার্থী ও গবেষকদের নিরাপদ পরিবেশে কাজ করার সুযোগ দিতে চাই।”
তিনি ভাড়াবাড়িতে বসবাসরত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও পুলিশের সহযোগিতা চান। পুলিশ কর্মকর্তারাও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
কুয়েট শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন জানান, “আমরা নতুন উপাচার্যের অপেক্ষায় ছিলাম। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর আমরা আশাবাদী। একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।”
তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশৃঙ্খলা চলছে। আমাদের দাবি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী একাডেমিক ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। নতুন উপাচার্য সে বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন।”
তবে তিনি জানান, এখনও পর্যন্ত শিক্ষক সমিতির সঙ্গে উপাচার্যের আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়নি।
রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় প্রশাসনিক ভবনে শিক্ষক সমিতির সঙ্গে উপাচার্যের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে। বৈঠকের ফলাফল অনুযায়ী সমিতি তাদের সিদ্ধান্ত শিগগির জানাবে বলে জানা গেছে।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি, কুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ বেঁধে যায়, যাতে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। এরপর থেকে টানা ১৬০ দিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে।
ঘটনার পর সরকারের পক্ষ থেকে তৎকালীন উপাচার্য ও প্রো-ভিসিকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর গত ১ মে চুয়েটের অধ্যাপক হযরত আলীকে অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, তবে শিক্ষক সমাজের বিরোধিতায় ২২ মে তিনি পদত্যাগ করেন।
এরপর সরকার ১০ জুন স্থায়ী উপাচার্য নিয়োগের জন্য একটি প্রজ্ঞাপন জারি করলেও তা বাস্তবায়নে অগ্রগতি হয়নি। অবশেষে ২৪ জুলাই দায়িত্ব পান অধ্যাপক ড. হেলালী।